জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একেবারে শেষ সময়ে এসে কুড়িগ্রামের চারটি সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশে মাঠ মুখর থাকলেও ভোটের ফলাফল নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। কে জয়ী হবেন, এ মুহূর্তে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সরজমিনে স্থানীয় সাংবাদিক, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকরা সক্রিয় থাকলেও প্রকাশ্যে মত দিচ্ছেন মাত্র ৩০ শতাংশ ভোটার। বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার নীরব, মুখ খুলছেন না তারা। ফলে শেষ মুহূর্তে ভোটের হিসাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগপন্থী ও সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যে প্রার্থী এই ভোটব্যাংক নিজের দিকে টানতে পারবেন, জয়ের পথে তিনিই এগিয়ে থাকবেন।
কুড়িগ্রাম-১
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মনোনীত ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা, ১১ দলীয় জোটের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘হাতপাখা’ প্রতীকের প্রার্থী হারিসুল বারী রনি এবং গণঅধিকার পরিষদের ‘ট্রাক’ প্রতীকের প্রার্থী বিন ইয়ামিন মোল্লা।
এ আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮১ হাজার ৪২৪ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৫১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন।
স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে ধানের শীষ, ‘দাঁড়িপাল্লা’ ও ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের মধ্যে। তবে কে বিজয়ী হবেন তা এখনও অনিশ্চিত।
কুড়িগ্রাম-২
এ আসনে প্রার্থীরা হলেন— বিএনপির প্রার্থী সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের ড. আতিক মুজাহিদ (শাপলা কলি), জাতীয় পার্টির পনির উদ্দিন আহমেদ (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের অধ্যক্ষ নুর বখত (হাতপাখা), নাগরিক ঐক্যের মেজর (অব.) মুহাম্মদ আবদুল সালাম (কেটলি), সিপিবির নূর মোহাম্মদ (কাস্তে), এবি পার্টির নজরুল ইসলাম খান (ঈগল), স্বতন্ত্র প্রার্থী সাফিউর রহমান (হাঁস)।
এখানে মোট ভোটার রয়েছেন ৬ লাখ ৪ হাজার ৭৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৯০, নারী ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৪১ ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৭ জন।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজারহাট উপজেলায় হিন্দু ভোটারদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা পলাতক থাকলেও তাদের সমর্থক-ভোটাররা ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
কুড়িগ্রাম-৩
এ আসনের প্রধান প্রার্থীরা হলেন— বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী তাসভীর-উল ইসলাম, ১১ দলীয় জোটের ‘দাঁড়িপাল্লা’র প্রার্থী ড. মাহবুবুল আলম সালেহী, জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের প্রার্থী আব্দুস সোবহান সরকার, ইসলামী আন্দোলনের ‘হাতপাখা’র প্রার্থী ডা. আক্কাছ আলী সরকার, গণঅধিকার পরিষদের ‘ট্রাক’ প্রতীকের প্রার্থী নুরে এরশাদ সিদ্দিকী, স্বতন্ত্র ‘হাঁস’ প্রতীকের প্রার্থী সাফিউর রহমান।
এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭০ জন। এর মাঝে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৪ জন এবং নারী ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৬ জন।
এখানেও আওয়ামী লীগপন্থী ও হিন্দু ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফলে ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এই ভোটব্যাংক নিজের দিকে টানতে চেষ্টা চালাচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম-৪
এই আসনের প্রার্থীরা হলেন— বিএনপির আজিজুর রহমান (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের মোস্তাফিজুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির কে এম ফজলুল হক মণ্ডল (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের হাফিজুর রহমান (হাতপাখা), বাসদ (মার্ক্সবাদী) রাজু আহমেদ (মই), স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রুকুনুজ্জামান (বালতি)।
এ আসনে রয়েছে ভিন্ন মাত্রার লড়াই। আসনটিতে ধানের শীষ ও ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন আপন দুই ভাই।
ব্রহ্মপুত্র নদ বিচ্ছিন্ন করেছে কুড়িগ্রামের এ এলাকাগুলোকে। পাশাপাশি ভাটিয়া ও উজানী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে সামাজিক বিভাজন। ফলে ভোটের মাঠে বিরাজ করছে নানা জটিল সমীকরণ।
কুড়িগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, বিগত নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় মানুষ ভোটের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার এখনও ভোটে অনাগ্রহী। তবে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলে শেষ মুহূর্তে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, কুড়িগ্রামের চার আসনেই নির্বাচন নিয়ে উত্তাপ থাকলেও জয়-পরাজয়ের হিসাব এখনও অঙ্কের বাইরে, শেষ সিদ্ধান্ত নেবে নীরব ভোটারা—এমন অভিমত স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষক, ভোটার ও সচেতন মহলের।